৯ম-১০ম শ্রেণী প্রবন্ধ রচনাঃ মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার

ভূমিকা : মাদকাসক্তি আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। এটি মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে মাদকাসক্তি আমাদের সমাজে এক সর্বনাশা ব্যাধিরূপে বিস্তার লাভ করেছে। দুরারোগ্য ব্যাধির মতোই তা তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে। এটি মায়ের বুক থেকে তার তরুণ ছেলেকে কেড়ে নেয়। ধ্বংস করে দেয় একটি রত্নকে। এই ব্যাধি আজ প্রতিটি পরিবারে ছড়িয়ে দিয়েছে ভয়াবহ আতঙ্ক। এটি শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিকেই ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে পুরো সমাজকে।

মাদকাসক্তি কী? : মাদকাসক্তি হলো ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর এমন একটি মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া, যা জীবিত প্রাণী ও মাদকের পারস্পরিক ক্রিয়ার মধ্য দিয় সৃষ্টি হয়। যে দ্রব্য গ্রহণের ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে এবং ঐ দ্রব্যের প্রতি নির্ভরশীলতা সৃষ্টির পাশাপাশি দ্রব্যটি গ্রহণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে, এমন দ্রব্যকে মাদকদ্রব্য বলে। ব্যক্তির এই অবস্থাকে বলে মাদকাসক্তি। তাই মাদকাসক্তি বলতে মাদকদ্রব্যের প্রতি নেশাকে বোঝায়।

মাদকদ্রব্য কী? : যেসব দ্রব্য গ্রহণ করলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং সেগুলোর প্রতি সেবনকারীর প্রবল আসক্তি জন্মে যেসব দ্রব্যকে মাদকদ্রব্য বলে। মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব দ্রব্য, যা প্রয়োগে মানবদেহে মস্তিষ্কজাত সংজ্ঞাবহ সংবেদন হ্রাস পায়। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য চালু আছে। মদ, গাঁজা, ভাঙ, আফিম ইত্যাদির নেশা বহু প্রাচীন। এছাড়াও আছে হেরোইন, মারিজুয়ানা, কোকেন, মরফিন, এলএসডি, প্যাথেড্রিন, চরস, পপি, হাশিশ, ক্যানবিস, স্মাক, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি।

মাদকাসক্তির কারণ : একজন ব্যক্তির মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো পারিবারিক অনুশাসনের অভাব, হতাশা, বেকারত্ব, অসৎ সঙ্গীদের প্ররোচনা, কর্ম বা শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতা, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ইত্যাদি।
. পারিবারিক কলহ : পারিবারিক কলহ এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও সৌহার্দের অভাব একটি কিশোরের ভুল পথে যাওয়ার মূল কারণ। সুস্থ সামাজিক পরিবেশের অভাবেও অনেক কিশোর-কিশোরী মাদকের সংস্পর্শে আসে।
২. হতাশা : হতাশা আমাদের যুবসমাজের মাদকাসক্ত হওয়ার একটি প্রধান কারণ। মানুষ সাধারণত নিজেকে নিয়ে অনেক উচ্চ আশা পোষণ করে আর এই আশা পূরণ করতে যখন সে ব্যর্থ হয় তখনই এই হতাশা কাটানোর একটি পথ হিসেবে সে মাদককে বেছে নেয়।
৩ কৌতূহল : কিশোর-কিশোরীদের মাদকাসক্ত হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে কৌতূহল। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আগ্রহ মানুষের সর্বকালের। এই কৌতূহলের বশেই পরিচয় ঘটে মাদকের সাথে।
৪. কুসংসর্গ : পরিবেশ একজন মানুষের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অনেক সময় মাদকের সাথে প্রায় অপরিচিত একজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত বন্ধু বা সঙ্গীদের প্রভাবে নিজের অজান্তে, মাদকদ্রব্য সেবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
এছাড়াও পারিবারিক ও সামাজিক নানা অস্থিতিশীল পরিবেশ একজন মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে দায়ী থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার : উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ ভয়াবহ মাদকাসক্তির শিকার। বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য ব্যবহারের পরিমাণ ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণামতে এ দেশের ১৭ ভাগ লোক মাদকাসক্ত। এ দেশে অবৈধভাবে প্রচুর পরিমাণে মাদক বিক্রি হয় এবং মাদকদ্রব্যের এই সহজলভ্যতাই আমাদের দেশে দিন দিন মাদকগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করছে।

মাদকাসক্তির পরিণাম/কুফল : মাদকাসক্ত ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে। কখনো খারাপ লোকের প্ররোচনা, হতাশা, নৈরাশ্য অথবা নিছক কৌতূহলবশত একবার মাদক গ্রহণ শুরু করলে সে আর এই নেশা থেকে ফিরে আসতে পারে না। দিনের পর দিন তার এ নেশা আরো বাড়তে থাকে। অনেকেই ভাবে মাদক গ্রহণের মাধমে তারা তাদের দুঃখকে ভুলে থাকার শক্তি পায়। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মাদক মানুষের মানসিক সুস্থতাকে নষ্ট করে তাকে মানসিকভাবে আরো দুর্বল করে তোলে। মাদক গ্রহণের ফলে মানুষের আচরণেও অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি অত্যন্ত সহজেই অনৈতিক ও বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ে। মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য পরিবারে অশান্তির সৃষ্টি করে, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি অসৎ পথ অবলম্বন করে। তারা পরিবার এবং সমাজে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। মাদকদ্রব্য দেহ ও মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এর ফলে বিভিন্ন জটিল ও দুরারোগ্য রোগব্যাধি দেহকে আচ্ছন্ন করতে থাকে। ব্যক্তিত্বের অবসান ঘটে ও কর্মক্ষমতা লোপ পায়।

প্রতিরোধের উপায় : মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ রোগ। পশ্চিমা বিশ্বে যে সমস্যা এখন তুঙ্গে। আমাদের দেশে সে তুলনায় এখনও তা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তাই প্রাথমিক অবস্থায়ই এর প্রতিকার করা উচিত। নিম্নলিখিতভাবে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি।
১. প্রথমেই প্রয়োজন প্রতিটি ব্যক্তির মাদকের কুফল সম্পর্কে জানা। এ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি।
২. ছোটবেলা থেকে শিশুদের মাদক সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যেন সহজেই তারা প্ররোচিত না হয়।
৩. মানবিক মূল্যবোধ গঠন ও পরিবেশন।
৪. বেকারত্ব দূরীকরণের ব্যবস্থা।
৫. ব্যক্তিগত ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি।
৬. মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও ভয়াবহতা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য প্রচার করা।
৭. বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অফিস, সংস্থা, দপ্তরকে ধূমপান ও মাদকমুক্ত এলাকা ঘোষণাপূর্বক তা কার্যকর করা।
৮. মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা দূরীকরণ।

উপসংহার : মাদকাসক্তির সর্বনাশা ছোবল দেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের জন্য মাদকাসক্তি নির্মূল করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা ও দৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তবেই আমরা পেতে পারি একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.